শরীয়তপুরে স্মার্ট সেবার আড়ালে ভোগান্তি: সুশাসনের সংকটে ডিসি অফিস, সর্বত্র স্থবিরতা
ঢাকা, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
শরীয়তপুর প্রতিনিধি :
Publish : 09:57 AM, 26 September 2026.
Digital Solutions Ltd

শরীয়তপুরে স্মার্ট সেবার আড়ালে ভোগান্তি: সুশাসনের সংকটে ডিসি অফিস, সর্বত্র স্থবিরতা

Publish : 09:57 AM, 26 September 2026.
শরীয়তপুরে স্মার্ট সেবার আড়ালে ভোগান্তি: সুশাসনের সংকটে ডিসি অফিস, সর্বত্র স্থবিরতা

ছবি: সংগৃহীত

শরীয়তপুর প্রতিনিধি :

শরীয়তপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় কাগজে-কলমে 'ডিজিটাল ও স্মার্ট সেবা'র বুলি ছড়ানো হলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পোর্টাল নিয়মিত হালনাগাদের নিয়ম থাকলেও, এখানকার তথ্য বাতায়ন একপ্রকার অচল। বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের তালিকা আপডেট হয় না, কাজ করে না জরুরি যোগাযোগের নম্বরও। ফলে অনলাইনে তথ্য খুঁজতে গিয়ে প্রতিদিন চরম বিভ্রান্তি আর ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

অন্যদিকে - অনলাইনের এই স্থবিরতা ছাপিয়ে জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শাখা, আইনশৃঙ্খলা কমিটি, শিক্ষা খাত, রাজস্ব দপ্তর এবং নারী উন্নয়নমূলক অধিদপ্তরগুলোতে জেঁকে বসেছে অনিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতা। অথচ জেলা প্রশাসক পদাধিকারবলে জেলার আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটি, জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি, জেলা রাজস্ব প্রশাসনসহ সরকারি প্রতিটি দপ্তর ও নারী উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রধান অভিভাবক ও সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

(এলআর ফান্ডের নামে 'ফি' ২৫ হাজার, টাকা নিয়েও ৩টি চূড়ান্ত ফাইল বাতিল!)

অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স শাখায় এক নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ভেন্ডার লাইসেন্সসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক লাইসেন্স সহজীকরণ ও প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভেন্ডার লাইসেন্সের জন্য যেখানে সরকার নির্ধারিত ফি মাত্র ৯৫০ টাকা, সেখানে জেলা প্রশাসকের এলআর ফান্ডের (লোকাল রিসিট ফান্ড) নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ২৫,০০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত ২৫ হাজার টাকা লোকাল ফান্ডে জমা দেওয়ার পরও ভুক্তভোগীরা লাইসেন্স বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাননি। উল্টো, সমস্ত আইনি प्रक्रिया ও তদন্ত শেষে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ভেন্ডার লাইসেন্সের ফাইল কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এমন খামখেয়ালি ও স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তে মোটা অঙ্কের টাকা খুইয়ে চরম আর্থিক ক্ষতি ও আমলাতান্ত্রিক ভোগান্তির শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা।

(রেকর্ড রুমে শামসুন্নাহারের 'সিন্ডিকেট')

কার্যালয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা কেন্দ্র 'রেকর্ড রুম' বা মহাফেজখানা এখন দুর্নীতির প্রকাশ্য আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে শামসুন্নাহার নামের এক রেকর্ড কিপার দীর্ঘদিন ধরে একই কক্ষে টিকিয়ে রেখেছেন তার একক রাজত্ব। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, টাকা ছাড়া এখানে কোনো ফাইল নড়ে না।

তবে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পান না অধিকাংশ মানুষ। কারণ জেলা প্রশাসক হলেন জেলার প্রধান অভিভাবক ও বিচারিক ক্ষমতার প্রধান কর্মকর্তা। সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক- আজ যদি তারা এই প্রশাসনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেন, তবে ভবিষ্যতে আমলাতান্ত্রিক প্রতিশোধের মুখে পড়তে হবে এবং এই অফিস থেকে আর কখনোই কোনো সেবা পাওয়া সম্ভব হবে না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন, টেবিলে টেবিলে টাকা না দিলে পর্চা বা খতিয়ান পাওয়া যায় না। ডিসি স্যারের অফিসের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বললে পরে আর কোনোদিন এই অফিসে কাজ করতে পারব না, তাই মুখ খোলার সাহস পাই না।

অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে রেকর্ড কিপার শামসুন্নাহার বলেন, "এখানে কোনো অনিয়ম হয় না। নিয়ম মেনেই সব কাজ করা হচ্ছে। দুর্নীতি বা সিন্ডিকেটের অভিযোগ মিথ্যা।"

(ফৌজদারি মামলার আসামিও বহাল তবিয়তে!)

অফিসের চেইন অব কমান্ড কতটা ভেঙে পড়েছে, তার বড় প্রমাণ কার্যালয়ের কর্মচারী মোঃ কবিরুল আলম খান। জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে পালং থানায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা (সি.আর. মামলা নং-৪৯২/২০২৬) চলমান এবং বিজ্ঞ আদালত তা আমলে নিয়েছেন। 'সরকারি চাকরি আইন ২০১৮'-এর ৩৯(১) ধারা অনুযায়ী তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার স্পষ্ট বিধান থাকলেও, অদৃশ্য খুঁটির জোরে তিনি বহাল তবিয়তে চেয়ার দখল করে আছেন।

যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত কর্মচারী মোঃ কবিরুল আলম খান বলেন, "আমার বিরুদ্ধে মামলাটি মিথ্যা। চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বড় স্যারদের সিদ্ধান্ত, আমার নয়।"

(আইনশৃঙ্খলা ও রাজস্ব দপ্তরের প্রধান, তবুও নিয়ন্ত্রণে নেই শৃঙ্খলা)

জেলা প্রশাসক জেলার আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। কিন্তু বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও রাজস্ব শাখাগুলোর কার্যক্রমে সাধারণ মানুষের হয়রানি কোনোভাবেই থামছে না। বিশেষ করে ইউনিয়ন সহকারী ভূমি অফিসগুলো যেন এক একটি ওপেন দোকান ঘর, যেখানে নামজারির জন্য চলে ইচ্ছেমতো রেট কষাকষি। অথচ জেলা রাজস্ব প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান তদারকি বা শুদ্ধি অভিযান লক্ষ্য করা যায়নি।

(শিক্ষা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন ধস: ডিসির তিন স্কুলেই ‘ফেল মাক’ রেজাল্ট)

জেলায় সুশাসন ও শীর্ষ আমলাতান্ত্রিক তদারকির অভাব কতটা প্রকট, তা প্রকাশ পেয়েছে ২০২৬ সালের সদ্য প্রকাশিত এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে পাসের হার যেখানে ৬২.২৫% এবং ঢাকা বোর্ডে ৭১.৬০%, সেখানে শরীয়তপুর সদর উপজেলায় এই হার নেমে এসেছে মাত্র ৪৬.২৫%-এ। আর এই নজিরবিহীন ধসের মূলে রয়েছে খোদ জেলা প্রশাসকের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ও সভাপতিত্বে থাকা প্রধান তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জেলা প্রশাসক যে স্কুলের ভর্তি কমিটির সভাপতি, সেই ঐতিহ্যবাহী পালং তুলাসার গুরুদাস সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৩৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১২১ জনই ফেল করেছে; পাসের হার মাত্র ৪৮.০৭%। জেলা প্রশাসক কর্তৃক সরাসরি পরিচালিত কালেক্টরেট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থা আরও করুণ, সেখানে ২৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬ জনই ফেল করেছে, পাসের হার মাত্র ৩৩.৩৩% এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যা শূন্য। একইভাবে জেলা প্রশাসকের তদারকিতে থাকা জেলার নারী শিক্ষার প্রধান বিদ্যাপীঠ শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ সদরের প্রধান স্কুলগুলোর এমন ফল বিপর্যয়ে পুরো জেলার শিক্ষাখাতে স্থবিরতা স্পষ্ট হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সাদিয়া ইসলাম সীমা দায়িত্বে থাকলেও এই বিপর্যয় ঠেকাতে শিক্ষা সেলের কোনো কার্যকর ভূমিকা ছিল না।

শরীয়তপুরের শিক্ষার এই নজিরবিহীন ভরাডুবি ও সদরের প্রধান স্কুলগুলোর নড়বড়ে দশা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা করেছেন শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, তুলাসার ও কালেক্টরেট পাবলিকের মতো জেলার অন্যতম প্রধান প্রধান স্কুলগুলোর দায়িত্ব যখন জেলা প্রশাসকের হাতে থাকে, তখন এই ব্যর্থতার দায় প্রশাসন এড়াতে পারে না। আমরা অবিলম্বে এর জবাবদিহিতা চাই।"

(কাগজে দায়িত্ব, বাস্তবে জাতীয় মহিলা সংস্থা ও মহিলা অধিদপ্তরের বেহাল দশা)

শুধু স্কুল-কলেজই নয়, জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম পদাধিকারবলে জাতীয় মহিলা সংস্থা-র জেলা শাখার চেয়ারম্যান এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর-এর জেলা ও উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে এই দুটি দপ্তরের নারী উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। অভিযোগ উঠেছে, জেলা প্রশাসক কেবল কাগজে-কলমে পদ ও দায়িত্ব প্রীতি দেখিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে নারীদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে সংস্থা দুটির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি ঘটেনি। নারীদের কর্মসংস্থানের নামে যেসব প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে, তা কেবল ভুয়া ও সাজানো কাগজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

এই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, "ওয়েবসাইট আপডেটের কাজ চলছে। আর অনিয়মের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।"

বিশেষ করে জেলা প্রশাসক মূলত সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে থাকেন।

সচেতন মহলের মতে, মুখে স্মার্ট সেবার কথা বলা হলেও শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনের এই গভীর অনিয়ম, শিক্ষা ও সামাজিক খাতের স্থবিরতা দূর করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কঠোর মনিটরিং ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশ বিভাগের অন্যান্য খবর

Search bd News

পশ্চিম যাত্রাবাড়ী, মদিনা মেডিকেল, ০৯ তালা।

সম্পাদক ও প্রকাশক
হুমায়ুন কবির সাগর

পরিচালক
মাহবুব আলম সৈকত

নিউজ
ফোনঃ +৮৮ ০১৭৭৫২১১১১৭
Email: [email protected]

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +৮৮ ০১৭৭৫২১১১১৭
Email: [email protected]

©২০২৪ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || Serach BD News

Develop by _ DigitalSolutions.Ltd
শিরোনাম ডামুড্যায় পূর্বতারা-শিমুলিয়া সড়ক নির্মাণে লক্ষাধিক মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি, পিআইও অফিসের তথ্য গোপনের চেষ্টা শিরোনাম শরীয়তপুরে স্মার্ট সেবার আড়ালে ভোগান্তি: সুশাসনের সংকটে ডিসি অফিস, সর্বত্র স্থবিরতা শিরোনাম পেটের ভেতর গজ রেখে সেলাই, চার মাস ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে নার্স বিথী শিরোনাম রাজাপুরে পুকুরে ডুবে আড়াই বছরের শিশুর মৃত্যু শিরোনাম জাসদ কার্যালয় থেকে সাংবাদিক নেতা আবু জাফর সূর্য আটক শিরোনাম বরিশালে গোপন বৈঠকে পুলিশের অভিযান, আটক ১২